অনেকদিন আগে মৃগাঙ্ক একটা লেখার বিষয় দিয়েছিলো; মোড়ক। খুব পছন্দ
হয়েছিল বিষয়টা। কিন্তু হাজার মাথা খুঁড়েও কিছুই বেরোয়নি হাত দিয়ে। যতবারই
লিখতে বসি ততবারই এদিক ওদিক করে কোনদিকে না জানি চলে যায় লেখাগুলো; মোড়কে
আর ধরে উঠতে পারি না। এসব বোধহয় মানসিক অস্থিরতার লক্ষণ, কোন জিনিস
বেশীক্ষণ ধরে রাখতে না পারা। বড়রা মাঝে মাঝে বলে থাকে, আহা, অত অধৈর্য্য
হলে চলে? লেগে থাকতে হবে তো ! কী করে বোঝাই ওই লেগে থাকা নিয়েই মনের যত
ওজর-আপত্তি। কি জানি ধৈর্য্য ধরাই বোধহয় হয়ে উঠবে না এ জীবনে।
জীবনের কথাই যখন উঠলো তখন একটা মরে যাওয়ার গল্প লিখি। এক দেশে এক
ছেলে ছিলো। অঙ্কের মাথা ভালো ছিলো বলে ইস্কুলে পড়তে মাঝেমধ্যে মাস্টারের
পিঠ চাপড়ানি পেত। পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে গানবাজনাতেও মন্দ ছিলো না।
এসবের সাথে হাসিখুশী ছিলো, হই হুল্লোড় ভালবাসত। সত্তরের দশকে এরকম ছেলে যে
নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে পড়বে এ একরকম হিসাবের মধ্যেই পড়ে। নকশালরা খারাপ কীনা
জানি না, কিন্তু শুট অ্যাট সাইট অর্ডার যে মোটেই ভালো কিছু না তা বুঝতে
অসুবিধে হয় না।ধুর ! বাজে হচ্ছে। আর লিখবো না এসব।
এর থেকে
প্রেম ভালো। আমার প্রেম নিয়ে লেখার খুব ইচ্ছে। আর হবে নাই বা কেন ! প্রেম
হল এমন একটা জিনিস যার গুরুত্ব বিশ্বচরাচরে অসীম। পৃথিবীর ৮০% সিনেমা প্রেম
নিয়ে বানানো। ৯০% পণ্য কোনো না কোনো ভাবে প্রেমের সাথে সংযুক্ত বলে দাবী
করা হয়। এই আজ সকালেই জানলাম সাফোলা সরষের তেল হৃৎপিণ্ডের স্বাস্থ্যবৃদ্ধি
করে প্রেমে যারপরনাই সাহায্য করে থাকে। সবাই যখন প্রেম নিয়ে এতদুর
আহ্লাদিত সেখানে আমি কিছু লিখতে গেলেই এরকম হয়ে যায় ...
- কী গো ! কখন থেকে কল করছি !
- ও ! তাই !
- ন্যাকা ! ফোন তুলছিলে না কেন?
- খুব ভারী রিসিভারটা
- হোয়াট ননসেন্স ! ...(একটু বিরতি)... রিসিভারটা ভারী লাগছিলো না আমি ভারী লাগছি?
- না মানে ... সে তোমাকে তো এমনিই বেশ ভারী ভারী লাগে
- সত্যি করে বল তো ... তুমি কি বেরিয়ে যেতে চাও ?
- কোথা থেকে?
- সম্পর্ক থেকে ... আমাদের ?
ব্যাস এই হয়ে গেল ! এই প্রশ্নের উত্তর আর বার করা যায় না।
কত চেষ্টা করি, গল্প আর এগোয় না। ভাগাড়ে পড়ে থাকা মৃতদেহের মত ক্ষয়ে যায়
আস্তে আস্তে। শুনেছি প্রেম খুব রোমাঞ্চকর । তবে গুলিগোলার রোমাঞ্চের কাছে
সেসব নিশ্চয়ই কিছু না। শুট অ্যাট সাইটে অন্য অনেকে মরে গেলেও সেই ছেলেটার
কিছু হয়নি। আমার মামা অনেক পরে মামীর সাথে ঝগড়া করে সুইসাইড করেছিলো।
মৃত্যু অনিবার্য্য... মৃত্যু চিরসত্য। তার ফাঁক দিয়ে জীবনের
একফালি আনাগোনার জন্য কেউ কারো কাছে দায়ী হয়ে থাকে না। অতএব নতুন করে কারো
যদি লিখতে ইচ্ছে হয়, "আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী না", তাহলে তার কপালে
জোটে ১০০তে শূন্য।
সব মোড়কেরই একটা ধর্ম থাকে; ভেতরের জিনিসটা যেমনই হোক না
কেন, মোড়কটাকে চকচকে হতেই হবে। বিবর্ণতাকে আড়াল করতে জন্ম হয় মোড়কের।
দেহপসারিণীর মত ক্রেতার চোখ টানায় জীবন অতিবাহন। এরপর প্রয়োজন ফুরায়। তার
অবস্থা হয় একমাত্র ছেলে হারানো মায়ের মত। রাস্তায় পড়ে একা একা কদিন চকচক
করে। তারপর পাশ দিয়ে গাড়ির চাকা গেলে দিগবিদিক ভুলে প্রাণপণে দৌড়ে যায়। আর
ফেরে না...
"তরী আমার হঠাৎ ডূবে যায়...
কোনখানে রে, কোন পাষাণের ঘায়"
ভালোবাসতে
সবাই পারে না। আর যারা পারে তাদের কপালে সবসময় ওটা জোটে না। অগত্যা অলীক
সুখের হাতছানিতে বেওয়ারিশ মোড়কের মতই অনিয়ত তাদের চলাফেরা, জীবনাচরণ।
ছোটোবেলায় উঠোনে পেয়ারা পাতা, শুকনো ডাল আর নুড়ি দিয়ে অনেক মিনার বানিয়েছি।
সেটা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেই দারুণ হইচই করতাম । জীবনও অনেকটা ওরকম ।
কোথাও কোনো কোণে একটু ভালোবাসা পেলেই অনেকটা পাওয়া হয়ে যায়। সাধারণ জীবন,
অল্পস্বল্প ভালোবাসা আর মৃত্যুর সময় একটু চোখের জল; ব্যাস, এটুকুই তো গল্প। এসব গল্পের কোনো নাম থাকে না, স্বভাব থাকে না, পথ থাকে না; জীবনে হারিয়ে
যাওয়া মানুষের মত এ মাঠ ও ঘাট সে বন্দর ঠোক্কর খেতে খেতে একসময় হাঁফিয়ে উঠে
শেষ হয়ে যায়। এ গল্পও তেমনই একটা লেখা, চশমার কাঁচে ফেলা নিঃশ্বাসের মত
যার অস্তিত্ত্ব একটু বাদেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে; নিঃশব্দে। অনেকে বাজ পড়লে
কানে আঙ্গুল দেয়। তারা আসলে জানে না পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দের নাম
নৈঃশব্দ্য।
দিন যায়, বিকেল গড়িয়ে রাত নামে। একটাও শব্দ না করে জীবন শেষ হয়ে যেতে থাকে । একদিন আমার জীবনও শেষ হয়ে যাবে। সবারই হয়; তা নিয়ে মনে কোন আক্ষেপও নেই । শুধু মাঝে মাঝে মনে হয়, মোড়ক নিয়ে লেখাটা আমি বোধয় কোনদিন শেষ করে উঠতে পারবো না।
দিন যায়, বিকেল গড়িয়ে রাত নামে। একটাও শব্দ না করে জীবন শেষ হয়ে যেতে থাকে । একদিন আমার জীবনও শেষ হয়ে যাবে। সবারই হয়; তা নিয়ে মনে কোন আক্ষেপও নেই । শুধু মাঝে মাঝে মনে হয়, মোড়ক নিয়ে লেখাটা আমি বোধয় কোনদিন শেষ করে উঠতে পারবো না।
No comments:
Post a Comment